ঈমান শব্দটি আমাদের কাছে খুবই সহজ এবং সাধারণ একটা বিষয় বলে মনে হয়। যেমন ধরুন - অনেকে বলে আমি নামাজ পড়িনা তাতে কি? আমার ঈমান ঠিক আছে। আচ্ছা বলুন, যে ব্যক্তি কখনোই নামাজ পড়েনা তার কি ঈমান থাকতে পারে? হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন , একজন মুসলিম এবং কাফেরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ছেড়ে দেয়া। (মুসলিম)। কারণ যে ব্যক্তি কালেমা পাঠের মাধ্যমে ঈমান গ্রহণ করে, তার ঈমান ধরে রাখার জন্য তাকে সর্বপ্রথম নামাজ কায়েমের মাধ্যমে ঈমানের বাস্তবায়ন করতে হবে। ঠিক তদ্রুপ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল কারীমের মাধ্যমে যা কিছু নাযিল করেছেন তার সকল কিছু বাস্তবায়নের নামই হচ্ছে ঈমান।
ঈমানের সংজ্ঞাঃ
ইসলামের যাবতীয় ইবাদত ও নেক আমলের বুনিয়াদ হচ্ছে ঈমান। ঈমান শব্দের অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস। ইসলামের যে কোন বিষয়ে অন্তরে বিশ্বাস রেখে মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে কাজে বাস্তবায়নের নামই হচ্ছে ঈমান।
১। হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং দ্বীনি বিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
২। হযরত আয়িশা (রাঃ) থেকে বণিতঃ
রাসূলূল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান গ্রহন হচ্ছে, ১. মুখে স্বীকৃতি, ২. অন্তরে বিশ্বাস, ৩. ইসলামের মূল বিষয় গুলো কাজে পরিনত করা (সিরাজি)।
তাহলে উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা গেল, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে যতগুলো বিধান দিয়েছেন, সব বিধান গুলোই অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং কাজে বাস্তবায়নের নামই ঈমান। কোরআনের কিছু অংশ মানা আর কিছু অংশ মানা থেকে বিরত থাকার নাম ঈমান নয়। (সূরা বাকারা - ৮৫) । ঈমানের ৭০ টির ও বেশী শাখা রয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- ঈমানের শাখা ৭০ টির চেয়ে বেশী আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা। হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত (বোখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, রিয়াদুস সালেহীন, হাদীস সম্ভার, মিশকাতুল মাসাবীহ, আদাবুল মুফরাদ)। ঈমানের এই ৭০ টিরও বেশী শাখার মধ্যে মৌলিক শাখা ৬ টি, যা পালন না করলে ঈমান থাকেনা। শাখা ৬ টি হলো - (১) আল্লাহ প্রতি ঈমান, (২) আল্লাহর তৈরী ফেরেশতা, (৩) আল্লাহর পাঠানো কিতাব, (৪) নবী - রাসূলগণ, (৫) তাকদীর, (৬) মৃত্যুর পর পুনরুথ্থান এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস।
উপরোক্ত ৬টি বিষয়ের মধ্যে ২টি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে ঈমান পোষণ করতে হবে। বাকি বিষয় গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকাই যথেষ্ট । যে দুইটি বিষয়ের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সাথে ঈমান রাখতে হবে তা হচ্ছে আল্লাহ এবং রাসূল (সাঃ) - (সূরা মুহাম্মাদ - ৩৩)। অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে সমস্ত বিধান কুরআনে বর্ণনা করেছেন এবং রাসূল (সা:) যে ভাবে সেই বিধান বাস্তবায়ন করে গেছেন বা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তার পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমেই ঈমানের পূর্ণ রুপরেখা প্রকাশ পায়। অন্যথায় আল্লাহর দেওয়া কিছু বিধান মান্য করা আর কিছু বিধান অমান্য করা এবং রাসূল (সাঃ) এর দেখানো পথের কিছু অংশ পালন করা আর কিছু অংশ পালন করা থেকে বিরত থাকা তাকে পরিপূর্ন ঈমান বলেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন - “তাহলে কি তোমরা কিতাবের একটি অংশের ওপর ঈমান আনছো এবং অন্য অংশের সাথে কুফরী করছো? তারপর তোমাদের মধ্য থেকে যারাই এমনটি করবে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হবে এবং আখেরাতে তাদেরকে কঠিনতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে? (সূরা বাকারা - ৮৫)।” আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈমানের মৌলিক বিষয় সমূহ যে সিরিয়ালে সাজিয়েছেন এর পিছনে নিঃস্বন্দেহে একটি কারণ রয়েছে। কারণটি হচ্ছে- মৌলিক বিষয়ের প্রতি বিক্ষিপ্তভাবে ঈমান আনলে ঈমানের বস্তুনিষ্ঠ বিষয়াবলী বুঝতে কঠিন হয়ে দাড়াবে। কিন্তু যদি সিরিয়াল বাই সিরিয়াল বুঝা যায় তাহলে ঈমানের বিষয়গুলো বুঝতে সহজ হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা বাকারার ২৮৫ নং আয়াতে বলেছেন- “তারা সবাই আল্লাহকে, তাঁর ফেরেস্তাদেরকে, তাঁর কিতাব সমূহকে ও তাঁর রাসূলদেরকে মানে।” এখানে ঈমানের এই চারটি বিষয়ে সিরিয়ালভাবে বলার মানে হচ্ছে, মহাপরাক্রম শক্তিশালী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরেস্তাদের মাধ্যমে তাঁর বিধান আদেশ অনুসারে বা কিতাব অনুসারে নবী-রাসূলদের কাছে পাঠিয়েছেন গোটা মানব জাতির হেদায়াত বা মুক্তির জন্য। এখন দেখাযাক ঈমানের মৌলিক ৬ টি বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা বলতে কি বুঝায়।